ইতিহাসের নির্মম ও অদ্ভুত সত্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো—যিনি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁর একমাত্র সন্তান এবং কোনো বংশধরই আজ পাকিস্তানের নাগরিক নন! বরং জিন্নাহর রক্ত ও উত্তরাধিকারীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয় নিয়ে আজ বহাল তবিয়তে বসবাস করছেন ভারতেই।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একমাত্র সন্তান ছিলেন দিনা ওয়াদিয়া, যার জন্ম ১৯১৯ সালের ১৫ আগস্ট লন্ডনে। ১৯৩৮ সালে দিনা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) এক সফল ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াদিয়া-র সাথে।
নেভিল ওয়াদিয়া পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন না। জিন্নাহ অত্যন্ত কঠোরভাবে চেয়েছিলেন তাঁর কন্যা যেন কোনো মুসলিমকে বিয়ে করেন। কিন্তু দিনা নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করায় পিতার সাথে তাঁর তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয় এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়।জন্ম: ১৫ আগস্ট, ১৯১৯ (লন্ডন) মৃত্যু: ২০১৭ (মুম্বাই, ভারত) স্বামী: নেভিল ওয়াদিয়া (পার্সি ব্যবসায়ী)
১৯৪৭ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ব্রিটিশ ভারতের বুক চিরে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। কিন্তু ইতিহাসের কী এক পরিহাস—বাবার তৈরি সেই নতুন দেশে পা রাখেননি দিনা ওয়াদিয়া।
তিনি ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মুম্বাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে ২০১৭ সালে এই মুম্বাই শহরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দিনা ও নেভিল ওয়াদিয়া দম্পতির ঘরে জন্ম নেন এক পুত্র নুসলি ওয়াদিয়া এবং এক কন্যা ডায়ানা ওয়াদিয়া।
নাতি নুসলি ওয়াদিয়া: তিনি ভারতের অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী শিল্পপতি। বর্তমানে ভারতের বিখ্যাত ‘ওয়াদিয়া গ্রুপ’-এর প্রধান হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
পরনাতিরা: নুসলি ওয়াদিয়ার দুই ছেলে—নেহাল ওয়াদিয়া ও জেহ ওয়াদিয়া।
জিন্নাহর এই নাতি-নাতনি ও পরনাতিরা প্রত্যেকেই ভারতের সম্মানিত নাগরিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা কেউই ‘জিন্নাহ’ উপাধি ব্যবহার করেন না এবং আজ পর্যন্ত কখনো পাকিস্তানে বসবাসও করেননি। ভারতে অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠিত নাগরিক হিসেবেই তারা তাদের জীবন কাটাচ্ছেন।
রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটা, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন এবং জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই—মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পুরো জীবনটাই ছিল অবিভক্ত উপমহাদেশের মুসলিম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক অবিচল সংগ্রাম।
নিজের জন্য তিনি কিছুই রেখে যাননি: না কোনো বিশাল পারিবারিক সম্পত্তি, না উত্তরসূরিদের জন্য ক্ষমতার কোনো মসনদ।
তিনি যা রেখে গেছেন, তা হলো একটি জাতির সার্বভৌম সত্তা, একটি নিজস্ব মানচিত্র এবং কোণঠাসা হতে যাওয়া কোটি কোটি মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার। ইতিহাসের আয়নায় জিন্নাহর জীবন তাই কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নয়; এটি একটি জাতির স্বপ্নের জন্য নিজের সমস্ত আবেগ, ব্যক্তিগত সুখ এবং শেষ নিঃশ্বাসটুকু নিঃসংকোচে বিলিয়ে দেওয়ার এক মহাকাব্যিক গল্প।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে জিন্নাহর শরীর মারাত্মক যক্ষ্মা ও ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ভেঙে পড়েছিল। চিকিৎসকরা তাঁকে কঠোর বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন—একটি জাতির জন্মলগ্নে অলস বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
নিজের ক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা বুকের ভেতরে চেপে রেখে তিনি দিন-রাত এক করে কাজ করে গেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে, তবুও প্রতিটি নিঃশ্বাস তিনি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর জাতির একটি নিরাপদ ঠিকানার জন্য।
১৯৪৭ সালে যখন নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্র আঁকা হলো, জিন্নাহ ততদিনে নিজের শরীরের শেষ শক্তিটুকুও নিঃশেষ করে ফেলেছেন। দেশভাগের মাত্র এক বছরের মাথাতেই (১৯৪৮ সালে) তিনি এই পৃথিবী ত্যাগ করেন।
আপনার কি মনে হয় ইতিহাসের এই বাঁকগুলো আমাদের অন্য কোনো বার্তা দেয়? কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান!
(ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না!)
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ