Hot Posts

6/recent/ticker-posts

প্রজ্ঞার বাতিঘর: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর অজেয় পথচলা

প্রজ্ঞার বাতিঘর: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

১৯৮১ সালের সেই ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে তাঁর ডান হাতটি অচল হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের কাছে তাঁর বেঁচে ফেরা ছিল এক অভাবনীয় 'মিরাকল'। কিন্তু সেই ক্ষত তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং এক হাত দিয়েই তিনি কয়েক দশক ধরে কাঁপিয়ে দিয়েছেন বিশ্ব রাজনীতির তখত। বিশ্বের কাছে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন এক অপরাজেয় ও দূরদর্শী রণকৌশলী হিসেবে।

জন্ম ও পরিচয়

পুরো নাম: সায়েদ আলী হোসেইনি খামেনি।

জন্ম: ১৯ এপ্রিল, ১৯৩৯ (ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদ)।

বংশ পরিচয়: তিনি রাসূল (সা.)-এর বংশধর (সায়েদ)। তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ সায়েদ জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। মাশহাদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তিনি পবিত্র কোম শহরে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত শিষ্য ছিলেন।

কেন তিনি অনন্য ও অপরাজেয়?

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই নন, বরং আধুনিক ভূ-রাজনীতির একজন নিপুণ কারিগর। তাঁর অনন্যতার কয়েকটি দিক হলো:

  • মেধার স্বাক্ষর ও কৌশলগত গভীরতা: তাঁর রচিত 'Palestine' বইটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদেরও অবাক করেছে। এর গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং কৌশলগত গভীরতা ফিলিস্তিন সংকটকে এক নতুন তাত্ত্বিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
  • ঐক্যের অগ্রদূত: একজন শিয়া নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সুন্নিদের পবিত্র ব্যক্তিত্বদের অবমাননা করাকে 'হারাম' ঘোষণা করেছেন। ফিলিস্তিনের সুন্নি যোদ্ধাদের পাশে অটলভাবে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, উম্মাহর ঐক্যই তাঁর কাছে সবার আগে।
  • বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা: তাঁর হাত ধরেই ইরান আজ ন্যানো টেকনোলজি, স্টেম সেল রিসার্চ এবং মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বের প্রথম সারিতে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই।

টাইম (Time)ফোর্বস (Forbes) ম্যাগাজিনের তালিকায় তিনি বারবার বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে স্থান পেয়েছেন। তাঁর একেকটি সিদ্ধান্ত ভূ-রাজনীতিতে বিশাল ঝড় তোলে।

শত্রুর প্রতি তাঁর শেষ অকুতোভয় বার্তা

আমেরিকা ও তার মিত্রদের অহেতুক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি সব সময়ই ছিলেন আপসহীন। তাঁর ভাষায়:

"আমাদের অবশ্যই প্রতিরোধমূলক অস্ত্র বা সরঞ্জাম থাকতে হবে। যদি কোনো দেশের কাছে এমন সক্ষমতা না থাকে, তবে সে শত্রুদের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে। এই প্রতিরোধমূলক অস্ত্র থাকা আমাদের জাতির জন্য অন্যতম একটি আবশ্যিক বিষয়।"

আমেরিকানদের প্রতি তাঁর কঠোর হুঁশিয়ারি ছিল:

"তোমাদের সাথে এর কী সম্পর্ক? এটি সম্পূর্ণ ইরান জাতির বিষয়। তোমাদের কাছে অমুক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে, অমুক ধরনের থাকবে না—এসব বিষয়ে তোমাদের কী বলার আছে? তাদের মনে হয় যে—যেমনটি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারবার বলেন—তাদের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। এই তথাকথিত শক্তিশালী সেনাবাহিনী হয়তো কোনো একদিন এমন এক প্রচণ্ড চড় বা আঘাত খাবে যে, তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।"

মুসলিম বিশ্বে তাঁর বে কিছু বিশেষ অবদান

  1. রেজিস্টি্যান্স অ্যাক্সিস (Axis of Resistance) গঠন: তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটি শক্তিশালী জোট গড়ে তুলেছেন। লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করার পেছনে তাঁর স্ট্র্যাটেজিক বুদ্ধিমত্তা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
  2. 'ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ' প্রচার: শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বাড়াতে তিনি রাসূল (সা.)-এর জন্ম তারিখের মতভেদকে ঐক্যের সপ্তাহে রূপান্তর করেন।
  3. 'সফট ওয়ার' (Soft War) মোকাবেলা: মুসলিম বিশ্বের তরুণদের ওপর পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে তিনি সব সময় সতর্ক করেছেন।
  4. ফিলিস্তিন ইস্যুতে গণভোটের প্রস্তাব: তিনি ফিলিস্তিনের আদি অধিবাসী সবার অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক গণভোটের মাধ্যমে সংকট সমাধানের যৌক্তিক প্রস্তাব দিয়েছেন।
  5. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা (Scientific Jihad): মুসলিম বিশ্বকে বিজ্ঞানে উন্নত হওয়ার ডাক দিয়ে তিনি ইরানকে আধুনিক প্রযুক্তির শিখরে নিয়ে গেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও কৃচ্ছ্রসাধন

বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত সাদাসিধা। তাঁর বাসভবন এবং জীবনযাত্রার মান একজন সাধারণ মানুষের মতো। পশ্চিমা মিডিয়াগুলোও তাঁর এই মিতব্যয়ী ও কঠোর শৃঙ্খল জীবন দেখে অবাক হয়েছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর অভাব অপূরণীয়।

তাঁর পরিবার, ইরানের জনগণ এবং বিশ্বজুড়ে তাঁর অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমীন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments