Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

গাজীপুর জামাই মেলা (বিনিরাইল মাছের মেলা) ২০২৬

গাজীপুরের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল কয়েকটি আয়োজনের মধ্যে গাজীপুর জামাই মেলা বা মাছের মেলা অন্যতম। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো এই উৎসবটি বিশাল আকৃতির মাছের সমাহারের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। মেলা উপলক্ষে এলাকার জামাইদের বিশেষভাবে দাওয়াত দেওয়া আর জামাইরা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় সেরা মাছটি নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। ২০-৩০ কেজি ওজনের নিয়মিত বড় বড় মাছের পাশাপাশি দুই থেকে দেড় মণ ওজনের মাছও এখানে দেখা মেলে। পাশাপাশি মেলায় নানান তৈজসপত্র, আসবাবপত্র এবং হরেক রকমের মিষ্টির আয়োজনও থাকে দেখার মতো।

১৪ নাকি ১৫ জানুয়ারী মেলা? যা নিয়ে প্রতি বছরই হয় বিতর্ক। মেলাটি মূলত পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি সাধারণত ১৪ জানুয়ারিতে পড়ে এবং লিপ ইয়ারে ১৫ জানুয়ারি হয়। যেহেতু ২০২৬ সাল লিপ ইয়ার নয়, তাই মেলাটি ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। যা মূলত বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয়।

গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। বিনিরাইল গ্রামটি কালীগঞ্জের জাঙ্গালীয়া, মোক্তারপুর ও জামালপুর—এই তিন ইউনিয়নের মোহনায় অবস্থিত।

ঢাকা-টঙ্গী থেকে: মীরের বাজার → কালীগঞ্জ → ফুলদি → বিনিরাইল মেলা।
গাজীপুর সদর  ও কালিয়াকৈর থেকে: জয়দেবপুর → নরুন → আজমতপুর → বিনিরাইল মেলা।
শ্রীপুর-গফরগাঁও-কটিয়াদী-মনোহরদীর দিক থেকে: কাপাসিয়া → চাঁদপুর → নোয়াপাড়া/ভাকুয়াদী → বিনিরাইল মেলা।
শিবপুর-পলাশ-ঘোড়াশাল থেকে: দোলন বাজার হয়ে সরাসরি বিনিরাইল মেলা।


গাজীপুরের জামাই মেলা (যা মূলত বিনিরাইল মাছের মেলা নামেও পরিচিত) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসব। প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো এই মেলাটি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়।

নিচে এই মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

১. মেলার সূচনা ও ইতিহাস

  • উৎপত্তি: লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুসারে, ব্রিটিশ আমলে (আঠারো শতকের দিকে) এই মেলার সূচনা হয়। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এটি প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি ঐতিহ্য।

  • শুরুটা যেভাবে: শুরুতে এটি ছিল অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার পর স্থানীয় কৃষকদের একটি ক্ষুদ্র আয়োজন। মূলত পৌষ সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসব উপলক্ষে স্থানীয় জেলেরা মাছ বিক্রির জন্য এখানে সমবেত হতেন।

  • নামকরণ: মেলাটি 'মাছের মেলা' হিসেবে শুরু হলেও সময়ের সাথে সাথে এর নাম হয়ে যায় 'জামাই মেলা'। কারণ, এই মেলা উপলক্ষে এলাকার প্রতিটি পরিবার তাদের মেয়ে ও জামাতাকে দাওয়াত করে নিয়ে আসে। জামাইরা মেলা থেকে বিশাল বিশাল মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি যান, যা এখন একটি সামাজিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।

২. মেলার সময় ও স্থান

  • সময়: প্রতি বছর বাংলা ক্যালেন্ডারের পৌষ মাসের শেষ দিন (পৌষ সংক্রান্তি) অথবা মাঘ মাসের প্রথম দিনে এই মেলা বসে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি সাধারণত ১৪ বা ১৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়।

  • স্থান: গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া, মোক্তারপুর ও জামালপুর ইউনিয়নের মোহনায় অবস্থিত বিনিরাইল গ্রাম। বিশাল খোলা বিলে এই মেলার আয়োজন করা হয়।

৩. প্রধান আকর্ষণ: মাছের মেলা

এই মেলার প্রধান প্রাণ হলো বিশাল আকৃতির সব মাছ।

  • মাছের ধরন: চিতল, আইড়, বোয়াল, বাঘাইড়, কাতল ও রুই মাছসহ নানা পদের সামুদ্রিক ও দেশীয় মাছ এখানে পাওয়া যায়।

  • প্রতিযোগিতা: মেলায় জামাই ও শ্বশুরদের মধ্যে বড় মাছ কেনার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলে। অনেকে কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা দিয়েও মাছ কেনেন কেবল আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের টানে।

৪. সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গুরুত্ব

  • সর্বজনীন উৎসব: শুরুতে এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পৌষ সংক্রান্তি উৎসবের অংশ থাকলেও বর্তমানে এটি সকল ধর্মের মানুষের জন্য একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

  • অন্যান্য পণ্য: মাছ ছাড়াও মেলায় আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, খেলনা এবং মুখরোচক মিষ্টির দোকান বসে। দূর-দূরান্ত (যেমন: টাঙ্গাইল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ) থেকেও হাজার হাজার মানুষ এই মেলা দেখতে আসেন।

  • ঐতিহ্য: ১৮ শ শতকের দিকে স্থানীয় এক জমিদারের উদ্যোগে এই মেলার শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। আদিতে এটি ছিল একটি ক্ষুদ্র মৎস্য মেলা, যা নবান্ন উৎসবের সাথে যুক্ত ছিল। কালক্রমে এটি জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পায় কারণ এই দিন জামাইরা মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি যান।


গাজীপুরের এই মেলাটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন, যা আজও পারিবারিক বন্ধন এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code