গাজীপুরের পিরুজালীতে ভাইরাল 'জয়না গাছ' বা কুসুম গাছ: প্রকৃতির এক লাল স্বর্গ
বিরল প্রজাতির জয়না বা কুসুম গাছের পরিচয়
এই জয়না গাছ বর্তমানে আমাদের দেশে একটি বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। একটা সময় ছিল যখন ভারতীয় উপমহাদেশ ও পূর্ব এশিয়ার গ্রাম-গঞ্জের ঝোপঝাড়ে বা বনের ধারে প্রচুর পরিমাণে এই গাছ দেখা যেত। বিশেষ করে চৈত্র মাসের খরতাপে এই গাছটি তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠত। তবে কালের বিবর্তনে এবং নগরায়নের ফলে এই গাছটি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। গাজীপুরের পিরুজালীর এই গাছটি টিকে থাকা সেই বিরল সৌন্দর্যেরই এক অনন্য নিদর্শন।
![]() |
| গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে অবস্থিত সেই অপূর্ব জয়না গাছ |
গাছের জাদুকরী বৈশিষ্ট্য: ঋতুতে ঋতুতে রূপবদল
এই জয়না বা কুসুম গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর রঙ পরিবর্তন। একেক ঋতুতে এই গাছ যেন নতুন নতুন পোশাকে সেজে ওঠে। বসন্তের আগমনে এই গাছে নতুন পাতা গজায়। বর্তমানে গাছটিতে যে টকটকে লাল রঙের কচি পাতা দেখা যাচ্ছে, তা দেখে মনে হবে যেন পুরো গাছটি লাল গালিচায় মোড়ানো। কিছুদিন আগে এই রঙ আরও গাঢ় ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাত্র কয়েকদিন পরেই এই লাল আভা বিদায় নিয়ে গাছটি একদম সতেজ সবুজ রঙ ধারণ করবে। প্রকৃতির এই জাদুকরী পরিবর্তন দেখার জন্যই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।
ঔষধি গুণাগুণ: প্রাকৃতিক ওষুধের আধার
জয়না গাছ শুধুমাত্র দেখার জন্যই সুন্দর নয়, এর রয়েছে অপরিসীম ঔষধি গুণ। যুগ যুগ ধরে গ্রাম বাংলার কবিরাজরা এই গাছের বিভিন্ন অংশ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে আসছেন:
- কুসুম তৈল: এই গাছের বীজ থেকে অত্যন্ত উপকারী কুসুম তেল নিষ্কাশন করা হয়।
- হজম ও রুচি: এর ফল খেলে হজমশক্তি বাড়ে এবং মুখে রুচি ফেরে। এছাড়া এটি কফ নাশক হিসেবেও কাজ করে।
- বাতের ওষুধ: কুসুম গাছের ছাল ফুটিয়ে বা বেটে বাতের ব্যথার উপশম করা হয়।
- তেলের ব্যবহার: কুসুম বীজ গরম জলে ফুটিয়ে, শুকিয়ে যে তেল বের করা হয় তা চর্মরোগসহ বিভিন্ন কাজে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
অবস্থান ও চারপাশের পরিবেশ
এই ভাইরাল জয়না গাছটি এমন এক স্থানে অবস্থিত যা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এর ঠিক পাশেই বয়ে গেছে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ শান্ত-স্নিগ্ধ সালদহ নদী। আপনি যখন গাছের তলায় দাঁড়াবেন, দেখবেন তিন দিকে দিগন্তজোড়া সবুজ ধান ক্ষেত আর এক দিকে নদীর কলতান। চৈত্রের মিষ্টি বাতাস যখন জয়না গাছের লাল পাতায় দোলা দেয়, তখন সেখানে এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি হয়।
আরেকটি মজার তথ্য হলো, এই স্থান থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই আপনি পাবেন জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় নন্দনকানন নুহাশ পল্লী। তাই পর্যটকরা একই সাথে দুই জায়গার স্বাদ নিতে পারেন।
ভ্রমণ নির্দেশিকা: কিভাবে যাবেন?
আপনি যদি এই চোখজুড়ানো জয়না গাছটি দেখতে চান, তবে আপনাকে আসতে হবে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া গ্রামে।
১. গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে: ঢাকা থেকে বাসে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে হোতাপাড়া অথবা ভবানীপুর বাসস্ট্যান্ডে নামবেন। সেখান থেকে অটো বা ইজিবাইক নিয়ে সরাসরি পিরুজালী গ্রামের পশ্চিম দিকে গেলেই দেখা মিলবে এই গাছের।
২. মাওনা হয়ে: শ্রীপুর বা মাওনা থেকে আসতে চাইলে বারতোপা বাজার হয়ে সরাসরি পিরুজালী গ্রামে প্রবেশ করা যায়।
পরামর্শ: যারা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আসবেন, তাদের জন্য হোতাপাড়া অথবা ভবানীপুর রুটটি সবচেয়ে বেশি আরামদায়ক হবে।

0 মন্তব্যসমূহ